| |
ভিডিও
ads for promotions
/
এআই: মানব মস্তিষ্কের প্রতিদ্বন্দ্বী নাকি সহায়ক?

এআই: মানব মস্তিষ্কের প্রতিদ্বন্দ্বী নাকি সহায়ক?

নিউজ ডেস্ক: নাগরিক আলো প্রতিবেদক

প্রকাশিত: 11 January, 2026

  • 6
আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা এআই মানবসভ্যতার উৎকর্ষে সর্বশেষ সংযোজন। বর্তমানে এআই এমন এক যন্ত্র যা অনেকটা মানুষের মতো চিন্তা করে, লিখে, ছবি আঁকে, এমনকি গান বানাতে ও গাইতে জানে।

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কী জিনিস— এমন প্রশ্নের উত্তর যদি সহজ বাংলায় দিতে হয়, তাহলে বলা যায়— এআই মূলত এমন এক ধরনের মানবসৃষ্ট চিন্তাশীল কম্পিউটার প্রোগ্রাম, যা নিজে নিজে বিভিন্ন বিষয়ে শিখতে পারে এবং আমাদের চারপাশে বিদ্যমান তথ্য ও উপাত্ত বিশ্লেষণ করে মানুষের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দিতে সক্ষম। এটিকে এক ধরনের কৃত্রিম মস্তিষ্কও বলা যায়।

 
মানুষ যেভাবে অভিজ্ঞতা থেকে শেখে, যুক্তি দিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়, ভাষা বোঝে বা ছবি চিনতে পারে এআই মূলত সেই কাজগুলোই কম্পিউটার প্রোগ্রাম বা মেশিনের মাধ্যমে সম্পন্ন করে।
 
ধরুন, আপনি ছোটবেলায় বিভিন্ন পশুপাখি বা মানুষের ছবি দেখে বুঝতে শিখেছেন কোনটি কুকুর আর কোনটি মানুষ। এআই ঠিক সেভাবেই ইন্টারনেটে বিদ্যমান সব তথ্য পর্যালোচনা করে প্রতিনিয়তই শিখে যাচ্ছে এবং মানুষের বিভিন্ন কমান্ডের উত্তর দিচ্ছে।
 
এআই–এর এই শিখন প্রক্রিয়াকে বলা হয় 'মেশিন লার্নিং'। আর যখন এটি মানুষের মস্তিষ্কের মতো জটিল গাণিতিক বা দার্শনিক বিষয়াদি শিখে ও বিশ্লেষণ করে, তখন তাকে বলে 'ডিপ লার্নিং'।
 
আজকের পৃথিবীতে মানুষের সব কল্পনাকে এআই বাস্তবে রূপ দিচ্ছে। কেউ কেউ একে বিজ্ঞানের 'সর্বোচ্চ বিপ্লব' আবার কেউ মানবসভ্যতার 'আসন্ন সংকট' হিসেবে দেখছেন। তবে এআই–কে আজকের অবস্থানে পৌঁছাতে পাড়ি দিতে হয়েছে দীর্ঘ পথ।

মেশিনও চিন্তা করতে জানে

 

১৯৫০ সালে ইংরেজ গণিতবিদ অ্যালান টুরিং তার লেখা Computing Machinery and Intelligence- এ প্রশ্ন করেন, 'যন্ত্র কি চিন্তা করতে পারে?' এই প্রশ্নটি আদতে সরল ও প্রযুক্তিভিত্তিক মনে হলেও এর পেছনে ছিল গভীর দার্শনিক অভিব্যক্তি। মূলত টুরিং- এর প্রশ্নটির মধ্যেই এআই- এর বীজ বপন করা হয়।

এর ছয় বছর পর, ১৯৫৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ডার্টমাউথ কলেজে অনুষ্ঠিত হয় এক বৈজ্ঞানিক সভা, যেখানে টুরিং- এর করা প্রশ্নটিকে কেন্দ্র করেই নানা আলোচনা হয়। এই সভাতেই বিজ্ঞানীরা প্রথম 'আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স' বা 'কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা' শব্দটি আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যবহার করেন। ডার্টমাউথ কলেজের এই সভাটিকেই এআই–এর জন্মমুহূর্ত হিসেবে গণ্য করা হয়।
 
প্রথম যুগের এআই ছিল নিয়মভিত্তিক লজিকের ওপর দাঁড়ানো খুব সহজ 'যদি–তবে' সূত্রে প্রোগ্রাম পরিচালিত হতো। তবে সময়ের সঙ্গে বিজ্ঞানীরা এআই–কে আরও শক্তিশালী চিন্তাশীল মাধ্যম হিসেবে গড়ে তুলতে উৎসাহী হন। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৮০–৯০ এর দশকে বিশ্বজুড়ে গবেষকরা মনোযোগ দেন মানুষের মস্তিষ্কের আদলে 'নিউরাল নেটওয়ার্ক' ও যন্ত্রের নিজস্ব চিন্তাশক্তি 'মেশিন লার্নিং' নির্মাণে।
 
প্রায় চার দশকের নানা গবেষণা, চেষ্টা, পরীক্ষা–নিরীক্ষার পর ২০১২ সালে 'অ্যালেক্সনেট' নামে একটি নিউরাল নেটওয়ার্ক মডেল আবিষ্কৃত হয়, যা বিভিন্ন চিত্র, ছবি ও স্থাপত্য মডেল শনাক্ত করতে পারে। মূলত অ্যালেক্সনেট– এর সাফল্যই 'ডিপ লার্নিং' যুগের সূচনা করে, যা আজকের চ্যাটজিপিটি, জেমিনি, মিডজার্নি প্রভৃতি এআই প্ল্যাটফর্মের পূর্বসূরি।

সময়ের আগে এআই নিয়ে ভাবনা

 

এআই বাস্তবে আসার বহু আগে মানুষ তা কল্পনায় সৃষ্টি করেছিল। সাহিত্যিক মেরি শেলি ১৮১৮ সালে তার ফ্রাঙ্কেনস্টাইন উপন্যাসে মানুষসৃষ্ট যে কৃত্রিম প্রাণের ধারণা দিয়েছিলেন, সেটিকে আজ অনেক পাঠকই এআই–এর পূর্বাভাস হিসেবে দেখেন।
 
চেক নাট্যকার কারেল চ্যাপেক তার 'রোসামস ইউনিভার্সাল রোবট' নাটকে প্রথম মানবসৃষ্ট চিন্তাশীল সত্তার কাল্পনিক ধারণা দেন। এই নাটকে শেষ পর্যন্ত রোবটরা মানুষকে প্রতিস্থাপন করতে মানবজাতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে।

তাছাড়া আধুনিক যুগের চলচ্চিত্র যেমন 'দা ম্যাট্রিক্স, এক্স ম্যাশিনা, আই রোবট' ইত্যাদিতে এআই– কে ঘিরে প্রেম, ভয়, প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও মানবীয় আবেগগুলোকে জীবন্তভাবে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে।
 

সভ্যতার সহযোগী এআই

 

এআই মানুষের জীবনে যে গতি ও সম্ভাবনা এনে দিয়েছে, তা অভাবনীয়। শিক্ষা, কৃষি, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রেই এআই আজ মানুষের প্রধান সহায়ক।
 
শিক্ষাক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা এখন বিভিন্ন বিষয়ে দ্রুত শিখতে পারছে। মাত্র একটি কমান্ডে দুষ্প্রাপ্য বই বা জটিল বিষয় সহজ ভাষায় তুলে ধরতে পারে এআই। এতে সময় ও ভোগান্তি দুটোই কমেছে।
 
চিকিৎসাক্ষেত্রেও এআই পাচ্ছে অভাবনীয় সাফল্য। জটিল সার্জারি, রোগ শনাক্তকরণ, স্ক্যান ও ইমেজিংয়ের কাজে আজ ব্যবহৃত হচ্ছে এআই। ক্রায়োসার্জারি, রেডিওথেরাপির মতো জটিল বিষয়ও নিখুঁতভাবে সম্পন্ন করছে এআই।

কৃষিক্ষেত্রে স্মার্ট সেন্সিং প্রযুক্তির মাধ্যমে শস্যক্ষেত পর্যবেক্ষণ করে ঠিক কোন সময় সেচ দিতে হবে, কখন কীটনাশক প্রয়োগ করতে হবে, তার পূর্বাভাস দিচ্ছে এআই।
 
এসবের বাইরে এআই বর্তমানে মানুষের সৃজনশীল চিন্তাভাবনা প্রকাশেরও অন্যতম মাধ্যম। আপনি যদি চ্যাটজিপিটি, সোরা এআই বা মিডজার্নির মতো প্ল্যাটফর্মে স্বপ্নে দেখা কোনো দৃশ্য বর্ণনা করেন, খুব অল্প সময়েই এআই সেটি ছবি বা ভিডিওচিত্রে রূপ দেবে।
 
এ থেকে বোঝা যায়, আপনি যদি এআইকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারেন, এটি আপনার 'দ্বিতীয় মস্তিষ্ক' হয়ে উঠতে পারে।

কিন্তু এআই মানুষকে অথর্ব করে দেবে না তো?

 

বর্তমানে এআই-কে ঘিরে সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হলো— চাকরির বাজারে শ্রমিক ও কর্মীদের স্থান দখল করছে এআই। ব্যাংকিং, হিসাবরক্ষণ, সাংবাদিকতা, অটোমেশন, সফটওয়্যার উন্নয়ন- সবখানেই এআই মানুষের চেয়ে দ্রুত কাজ করছে।

তবে বাস্তবে এআই সৃজনশীল নতুনত্ব আনতে তেমন সক্ষম নয়, কারণ এটি মূলত বিদ্যমান তথ্যের ওপর নির্ভরশীল। ইন্টারনেট বা সার্ভারে যদি কোনো তথ্য অনুপস্থিত থাকে, সে বিষয়ে এআই কোনো উত্তর দিতে পারবে না।
 
তাছাড়া তথ্যের গোপনীয়তা, নিরাপত্তা ও সংবেদনশীলতা রক্ষার ক্ষেত্রেও এআই এখনও সীমিত। মিথ্যা খবর, ভুয়া ছবি, বিভ্রান্তিকর তথ্য তৈরিতে এআই-এর অপব্যবহার এরইমধ্যে অনেক দেশকে উদ্বিগ্ন করেছে।
 

বিশ্বজুড়ে এআই নিয়ন্ত্রণে আইন

 

মানুষের তথ্যনিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কর্মক্ষমতা রক্ষার লক্ষ্যে ইউনেস্কো ২০২১ সালে 'কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নৈতিকতা' বিষয়ক সুপারিশ প্রকাশ করে। সেখানে বলা হয়, এআই যেন মানবাধিকারের পরিপন্থী না হয়ে বরং মানবিক মূল্যবোধ রক্ষায় সহায়ক হয়।

এছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়ন বর্তমানে এআই আইন প্রণয়নের কাজ করছে, যেখানে ঝুঁকিপূর্ণ এআই সিস্টেম নিষিদ্ধ এবং নজরদারি বা মুখ শনাক্তকরণের মতো কাজে ব্যবহারে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের প্রস্তাব রয়েছে।
 

সমাজ ও ক্ষমতার নবায়নে এআই

 

বর্তমানের সমাজবিজ্ঞানীরা এআই-কে একধরনের 'নতুন সামাজিক চুক্তি' হিসেবে দেখছেন। ইতিহাসবিদ ইউভাল নোয়া হারারি মনে করেন, ভবিষ্যৎ পৃথিবীতে যারা 'ডেটা' নিয়ন্ত্রণ করবে, তারাই পৃথিবী নিয়ন্ত্রণ করবে।

অর্থাৎ পৃথিবীর অর্থনীতি, শ্রমবাজার ও সম্পদের ভাগ্য নির্ধারক হবে এআই-এর নিয়ন্ত্রকেরা, যাদের হাতে তথ্যের ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত থাকবে অথবা এআই নিজেই হয়তো সেই নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করতে পারে।
 

মানসিক সংকট বয়ে আনবে এআই

 

বর্তমান সময়েই এআই মানুষের চিন্তা, আত্মপরিচয় ও আবেগের ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে। অনেকেই এখন ছোটখাটো বিষয়েও এআই–এর পরামর্শ নেয়, এমনকি এআই চ্যাটবটের সঙ্গে ভার্চুয়াল বন্ধুত্ব বা প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তুলছে।

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, এই 'যান্ত্রিক যোগাযোগ' মানুষকে কম সংবেদনশীল করছে এবং বাড়াচ্ছে 'ডিজিটাল নিঃসঙ্গতা'।
 
এছাড়া গল্প, ছবি বা সঙ্গীত তৈরিতে অতিরিক্ত এআই নির্ভরতা মানুষের সৃজনশীল সত্তাকে ক্ষয় করছে। সামাজিক মাধ্যমগুলোতে এআই নিয়ন্ত্রিত অ্যালগরিদম মানুষকে অপ্রয়োজনীয় বিষয়ের প্রতি আগ্রহী করছে। যা মনোবিশ্লেষকরা 'স্বাধীন ইচ্ছার ক্ষয়' বলে বর্ণনা করেন।
 
 

মানবিক ও সাংস্কৃতিক সংকট

 

এআই-এর প্রভাবে বদলাচ্ছে আমাদের সংস্কৃতির সংজ্ঞা। মানবজাতির একচ্ছত্র গর্ব- সৃজনশীলতা- আজ চ্যালেঞ্জের মুখে। এআই- ও এখন আঁকে, কবিতা লেখে, গান বানায়। তাহলে মানুষ আর এআই- এর মধ্যে ভিন্নতা কোথায়?

উত্তরটি হলো 'অনুভূতি'। মানুষ ভালোবাসতে জানে, কষ্ট পেতে জানে; সুখ–দুঃখের অনুভব তার আছে। মানুষের প্রতিটি আবিষ্কার ও শিল্পকলার পেছনে থাকে সংগ্রাম, ইতিহাস ও আবেগ- যা এআই হয়তো কখনোই অর্জন করতে পারবে না। তাই মানুষের কর্তব্য তার মানবিক পরিচয়টিকে অক্ষুণ্ণ রাখা।
 

এআই কি মানবিক হতে পারবে?

 

প্রযুক্তির উৎকর্ষের এই যুগে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মানবমুখী প্রযুক্তি তৈরি করা। প্রযুক্তি যেন মানুষের মানসিক সুস্থতা, নৈতিকতা ও সামাজিক ভারসাম্য রক্ষা করে- এতে নজর দিতে হবে।
 
যেমন: শিক্ষাক্ষেত্রে এআই- এর পাশাপাশি মানবীয় আবেগকে অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে; কর্মক্ষেত্রে অটোমেশনের সঙ্গে মানবিক যোগাযোগ বজায় রাখতে হবে; এবং প্রযুক্তি উন্নয়নে সমাজবিজ্ঞানী, দার্শনিক ও মনোবিজ্ঞানীদের ভূমিকা বাড়াতে হবে।



Share On:

0 Comments

No Comment Yet

Leave A Reply

Nagorik Alo is committed to publish an authentic, Informative, Investigate and fearless journalism with country’s people. A highly qualified and well knowledged young team of journalists always fetch real news of the incidents or contemporary events. Providing correct news to the country's people is one kinds of community service, Keeping this in mind, it always publish real news of events. Likewise, Nagorik Alo also promised to serve the Bangladeshi people who reside in out of the country.

সম্পাদক : মোঃ ইলিয়াস হোসেন ব্যবস্থাপনা সম্পাদক : আরিফুর রহমান info@nagorikalo.com যোগাযোগ : 30/A, সাত্তার সেন্টার ( হোটেল ভিক্টরি) লেভেল 9, নয়া পল্টন, ঢাকা--১০০০ +8801753634332

© ২০২৩ nagorikalo.com