মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আবার খুলছে—বাংলাদেশের লাখো কর্মপ্রত্যাশী মানুষের জন্য এর চেয়ে আশাব্যঞ্জক খবর খুব কমই হতে পারে
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আবার খুলছে—বাংলাদেশের লাখো কর্মপ্রত্যাশী মানুষের জন্য এর চেয়ে আশাব্যঞ্জক খবর খুব কমই হতে পারে। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর নতুন করে কর্মী নেওয়ার বিষয়ে মালয়েশিয়ার নীতিগত সম্মতি, প্রথম পর্যায়ে আগামী মাসে ১০ হাজার কর্মীকে বিনা খরচে পাঠানোর পরিকল্পনা এবং পরবর্তী সময়ে বিপুলসংখ্যক কর্মীর কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা নিঃসন্দেহে স্বস্তির। কিন্তু এই স্বস্তির সঙ্গে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্নও ফিরে এসেছে—অতীতের মতো এবারও কি মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার কয়েকটি এজেন্সির নিয়ন্ত্রণে গিয়ে নতুন কোনো সিন্ডিকেট তৈরি করবে?
এ প্রশ্ন তোলা কোনো রাজনৈতিক পক্ষপাত নয়; বরং অতীতের অভিজ্ঞতার আলোকে এটি একটি প্রয়োজনীয় নীতিগত সতর্কতা। কারণ, বিদেশে কর্মসংস্থান বাংলাদেশের জন্য শুধু ব্যক্তিগত অর্থনৈতিক সুযোগ নয়; এটি লাখো পরিবারের জীবন-জীবিকার সঙ্গে যুক্ত, দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস এবং একই সঙ্গে একটি বড় রাজনৈতিক অর্থনীতির ক্ষেত্র। এখানে সামান্য অস্বচ্ছতা মানেই একজন শ্রমিকের জীবনে ঋণ, জমি বিক্রি, দারিদ্র্য কিংবা সর্বস্ব হারানোর ঝুঁকি।
তাই এ প্রশ্নের উত্তর হয়তো এখনই দেওয়া সম্ভব নয়। তবে প্রশ্নটি উপেক্ষা করারও সুযোগ নেই। কারণ, অতীতে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, সীমিতসংখ্যক এজেন্সির প্রভাব এবং শ্রমিকদের ঋণগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ ছিল। ফলে নতুন করে বাজার খোলার সময় সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো পুরোনো সমস্যার পুনরাবৃত্তি ঠেকানো।
সরকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মালয়েশিয়া বাংলাদেশ থেকে আবার কর্মী নিতে নীতিগতভাবে রাজি হয়েছে। প্রথম ধাপে ১০ হাজার কর্মীকে বিমানভাড়াসহ সব ধরনের খরচ ছাড়াই বোয়েসেলের মাধ্যমে বিশেষ চার্টার্ড ফ্লাইটে পাঠানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের অভিবাসনব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত তৈরি হতে পারে। কারণ, সরকারি ব্যবস্থাপনায়, মধ্যস্বত্বভোগীর বাইরে থেকে, শ্রমিককে বিনা খরচে বিদেশে পাঠানো সম্ভব—এ বার্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু এ উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে শুধু ১০ হাজার মানুষকে পাঠানোর ওপর নয়; বরং পুরো শ্রমবাজারকে কীভাবে পরিচালনা করা হবে তার ওপর। কারণ, ১০ হাজারের পর আরও বিপুলসংখ্যক কর্মী পাঠানোর কথা বলা হয়েছে। বিভিন্ন বক্তব্যে প্রায় দুই লাখ কর্মীর সম্ভাবনার কথা এসেছে। ফলে এটি কোনো ছোট পরিসরের প্রশাসনিক উদ্যোগ নয়। এটি একটি বড় শ্রমবাজার পুনর্গঠনের পরীক্ষা। এখানেই ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সির বিষয়টি সামনে আসে।
শ্রমিকের খরচ কত
অভিবাসন ব্যয়ের ক্ষেত্রে সরকারকে এবার একটি মৌলিক নীতি গ্রহণ করতে হবে। শ্রমিকের কাছ থেকে যত টাকা নেওয়া হবে, তার প্রতিটি খাতের হিসাব থাকতে হবে। ভিসা, মেডিক্যাল, প্রশিক্ষণ, বিমানভাড়া, সরকারি ফি, সার্ভিস চার্জ—সবকিছুর সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করতে হবে। কোনো অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হলে তার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক অভিযোগ করার ব্যবস্থা থাকতে হবে। অভিযোগ তদন্তের জন্য স্বাধীন ব্যবস্থাও প্রয়োজন। এখানে বোয়েসেলের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
১০ হাজার কর্মী যদি সত্যিই বিনা খরচে বোয়েসেলের মাধ্যমে পাঠানো যায়, তাহলে সেটিকে শুধু একটি বিশেষ প্রকল্প হিসেবে না দেখে ভবিষ্যৎ অভিবাসনব্যবস্থার মডেল হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। বোয়েসেলের সক্ষমতা বাড়ানো, স্বচ্ছ ডিজিটাল আবেদনব্যবস্থা তৈরি এবং সরাসরি নিয়োগের সুযোগ বাড়ানো গেলে মধ্যস্বত্বভোগীর ওপর শ্রমিকের নির্ভরতা কমবে।
Share On:
0 Comments
No Comment YetLeave A Reply